ঢাকা টেস্ট
চাঁদের আলোয় মোড়া যে শুক্লপক্ষ এখন চলছে, তাতে একটা বড় দলের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশ দল দেখতেই পারে। ‘স্বপ্ন’ শব্দটা একটু দূরের, ‘আশা’ই বরং কাছাকাছি। অনেকে তাই ভাষাগত সংশোধনী দিয়ে বলতে পারেন, জয়ের আশা! তবে যা-ই বলুন, জয়ের স্বপ্ন কিংবা আশা জাগিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজের দ্বিতীয় বা শেষ টেস্ট শুরুর প্রাকমুহূর্তটাই কাল বাংলাদেশের কাছে ছিল মধুরতম। টস জিতলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তারপর...গোটা স্টেডিয়ামকে বিস্মিত করে নিজের দলের পরীক্ষিত শক্তির জায়গা ব্যাটিংকে উপেক্ষা করে নিলেন ফিল্ডিং।
ক্রিকেট-বিধাতা নামের একজন এতে রুষ্ট হলেন কি না কে জানে। ম্যাচের প্রথম বলটি করতে গিয়েই ফলোথ্রুতে পড়ে গেলেন পেসার শাহাদাত হোসেন, ব্যথা পেলেন হাঁটুতে। কোনোক্রমে দ্বিতীয় বলটি করলেন, একটা লোভনীয় ফুলটস—চার মারলেন মোহাম্মদ হাফিজ। মাঠের মধ্যে পড়ে যাওয়া শাহাদাতকে একটু শুশ্রূষা করে নিয়ে গেলেন ফিজিও, নিয়ে গেলেন আসলে ম্যাচেরই বাইরে। বাংলাদেশ পরিণত ১০ জনের দলে। এখন বিশেষজ্ঞ বোলার বলতে রইল বাকি দুই—ডানহাতি পেসার মোহাম্মদ শহীদ ও বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। অনুমানের বাইরে কিছু ঘটেনি। প্রথম দিন শেষেই চেপে বসেছে ৩২৩ রানের বোঝা, পাকিস্তানের হাতে উইকেট বাকি ৭।
আগের ম্যাচেই একজনের অভিষেক, আরেকজনের ফিটনেস প্রশ্নবিদ্ধ। এমন দুই পেসারের ভরসায় উইকেটে সামান্য ঘাস দেখে ফিল্ডিং নেওয়া ক্রিকেটের কোন সূত্রে পড়ে সে নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া, গোটা টেস্ট ক্রিকেটের পৃথিবীতেই প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না যে ব্যাটিং-বোলিংয়ে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিপক্ষের কাছে এটি দারুণ এক উপহার হিসেবেই গণ্য। দুহাত ভরেই তা নিয়েছে মিসবাহর পাকিস্তান।
প্রতিপক্ষের মনোবল হারিয়ে ফেলা বোলিংয়ের ষোলো আনা সুবিধা তোলার মতো ব্যাটসম্যান পাকিস্তানের অনেকই আছেন। সর্বাগ্রে ৯৮তম টেস্ট খেলতে নামা ইউনিস খান, তারপর অধিনায়ক মিসবাহ, একে একে আসবেন মোহাম্মদ হাফিজ, আজহার আলী, আসাদ শফিক, সরফরাজ আহমেদরা। শেষের দুজন ড্রেসিংরুমে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তার আগের কজন যা করে ফেলেছেন, তাতেই কাল রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার কথা মুশফিকের। গড়ে প্রতি ৬.১৭ ইনিংস পর পর সেঞ্চুরি পান ইউনিস খান। সেই হিসেবে প্রাপ্য সেঞ্চুরিটি তিনি করেও ফেলেছেন। দ্বিতীয় নতুন বল হাতে শেষের ৫ ওভার আগে গালিতে শুভাগত হোমের ক্যাচ বানিয়ে ১৪৮ রানে আতঙ্ক ছড়ানো এই ব্যাটসম্যানকে আউট করেছেন শহীদ, না হলে আরও কী দুর্গতি অপেক্ষা করছিল কে বলতে পারে! ধীরস্থির ইউনিস শেষ দিকেই ছিলেন আক্রমণাত্মক, ১১টি চারের সঙ্গে হাঁকিয়েছেন তিনটি ছক্কাও। সেঞ্চুরির পরপরই সাকিব আল হাসানের বাঁহাতি স্পিন মিড উইকেটের ওপর আছড়ে ফেলেছেন। ইউনিস গেছেন কিন্তু অষ্টম সেঞ্চুরি করে থেকে গেছেন বাংলাদেশ সফরে ‘মি. ধারাবাহিক’ আজহার আলী—অপরাজিত ১২৭ রানে। ৯ রানে ব্যাট করছেন মিসবাহ, মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় বলেই সাকিবকে ছক্কা মেরে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর মনের ভাষা।
আসলে প্রতি-আক্রমণ করে পরাজয়ের ক্ষতে একটু হলেও প্রলেপ বোলানোর ইচ্ছেটা পাকিস্তানের প্রতিটি ব্যাটসম্যানই প্রকাশ করেছেন। আজহারও যেমন তিন অঙ্ক ছুঁয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুলকে চার মেরে। তৃতীয় উইকেটে ২৫০ রানের জুটিতে ইউনিসের ১৪৮ রানের পাশে তাঁর অবদান ৯৬।
বিশাল এই জুটিটি বাংলাদেশের বোলারদের যেন করে দিয়েছিল অসহায়। মুশফিক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বল করিয়েছেন ৯ জনকে দিয়ে। আশাভরে ইমরুল কায়েসকে দিয়ে পর্যন্ত ১ ওভার অফস্পিন করিয়েছেন। বড় আশাটা তাঁর হয়তো ছিল সাকিবের কাছে। চার স্পেলে ১৪ ওভার বোলিং করেছেন সাকিব, কিন্তু বাংলাদেশের সেরা বোলারটি ৬৮ রান দিয়েও দিন শেষে রিক্তহস্ত। এই মাঠেই সর্বশেষ টেস্টটিতেই তাইজুল ৩৯ রানে ৮ উইকেট নিয়ে একাই শেষ করেছিলেন জিম্বাবুয়েকে। তাইজুলই কাল সবচেয়ে বেশি বল করলেন, চার স্পেলে ৩০ ওভার, শতরানের বিনিময়ে ফেরাতে পারলেন শুধু ওপেনার সামি আসলামকে।
তবে সকালের সেশনে দারুণ বোলিং করেছেন শহীদ। নিজের দ্বিতীয় ওভারেই ফিরিয়ে দিয়েছেন হাফিজকে (৮), অফস্টাম্পের সামান্য বাইরে বাড়তি লাফিয়ে ওঠা বলে মুশফিকের দস্তানায় ক্যাচ বানিয়ে। শেষবেলায় ইউনিসেরটি ছাড়াও আজহারের উইকেটটিও তাঁর প্রাপ্যই ছিল। ও রকমই এক বলে স্লিপে সৌম্য সরকারকে ক্যাচ দিয়েছিলেন আজহার। সবাই উল্লসিত। ঠিক তখনই অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স—তৃতীয় আম্পায়ারের রুটিনমাফিক পরীক্ষায় ধরা পড়ল ওটা নো-বল। আজহার তখন ১৮ রানে, দলের রান ১ উইকেটে ৩৯। একই দুর্ভাগ্য হয়েছে সৌম্যরও, চা-বিরতির পর পরই সৌম্যর বলে শর্ট কভারে সাকিবকে ক্যাচ দিয়েছিলেন ইউনিস। আবারও উল্লাসে জল ঢেলে দেয় ওই নো-বল পরীক্ষা। ইউনিস তখন ৭৮, পাকিস্তানের রান ২ উইকেটে ১৯৭। আজহারের রান যখন ৩৫, সাকিবের বলে শর্টলেগে দাঁড়ানো মুমিনুলের হাতের ফাঁক গলে যায় তাঁর ক্যাচ! দুর্ভাগ্য হয়তো এভাবেই হানা দেয়, সব কটা দরজা দিয়ে।
তবে বাংলাদেশের হতাশার দিনে একটু আলোর রেখা ওই শহীদ। উইকেটের সামান্য মুভমেন্ট ও বাউন্সকে কাজে লাগিয়ে টানা বল করে গেছেন অফস্টাম্পের বাইরে। ২১ ওভার বল করে ৪৩ রান দিয়ে ২ উইকেট। শহীদ যদি অন্য প্রান্ত থেকে সমর্থন পেতেন, বাংলাদেশের জন্য প্রথম দিনটি অন্য রকম হতে পারত। দিনের শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলে গেলেন ‘রাজীব ভাইয়ের অভাব’ বোধ করছেন। ‘তিনজন পেসার খেললে আরও ভালো লাগত’ তাঁর।
চাঁদের আলোয় ভেসে সুসময় আসে, তাতে আবার একটা মায়াবী বিভ্রমও তৈরি হয়। চলমান টেস্টটি শুরুর মুহূর্তে বাংলাদেশ সব ভালোর মধ্যেও যেমন একটি সত্যকে বেছে নিতে পারল না। এই সত্যের উল্টো পিঠে আজ হয়তো দ্বিতীয় দিনটি তাই মুশফিকদের জন্য হবে একটি খুব দীর্ঘ এবং তপ্ত।

১ম দিন শেষে

পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩২৩/৩

Post a Comment

 
Top